ভারতবর্ষ – সাহিত্যচর্চা (দ্বাদশ শ্রেণী বাংলা)

সাহিত্যচর্চা (দ্বাদশ শ্রেণী বাংলা) ভারতবর্ষ

ভারতবর্ষ – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

Table of Contents

ভারতবর্ষ – সাহিত্যচর্চা-দ্বাদশ শ্রেণী বাংলা


১. ‘বুড়ির শরীর উজ্জ্বল রোদে তপ্ত বালিতে চিত হয়ে পড়ে রইল’ – বুড়ির চেহারা ও পোশাকের পরিচয় দাও। তার শরীর তপ্ত বালিতে পড়ে থাকার কারণ কী? ২+৩

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ রচিত ‘ভারতবর্ষ’ গল্পে উল্লিখিত এক ভিখিরি বুড়ির কথা প্রশ্নোদ্ধৃত উক্তিটিতে বলা হয়েছে। পৌষে বাদলার এক সকালে ঝিরঝিরে হালকা বৃষ্টি আর উত্তুরে ঠাণ্ডা হাওয়া অগ্রাহ্য সেই থুরথুরে -কুঁজো – ভিখিরি বুড়ি একটা বেটে লাঠি হাতে নড়বড়ে পায়ে হাঁটতে হাঁটতে চায়ের দোকানে আড্ডা চলার মাঝে হাজির হয়। তার চেহারা যেন রাক্ষসের মতো, সাদা পাকা চুলে মাথা ভরতি। পরনে ছেঁড়া নোংরা কাপড় আর চিটচিটে তুলোর কম্বল গায়ে জড়ানো। তাছাড়া বুড়ির সুদীর্ঘ আয়ুর চিহ্ন তার মুখমন্ডলে স্পষ্ট।

পৌষে বাদলার দুর্যোগ কাটার পর সবাই আবিষ্কার করে বুড়ি বট গাছের তলায় চিৎ হয়ে পড়ে মারা গেছে। তার মড়া নিয়ে সবাই চিন্তায় পড়ে। মড়ার কিছু একটা গতি না হলে শেয়াল-কুকুরে ছিঁড়ে খাবে, তাছাড়া গন্ধও ছড়াবে। চৌকিদারকে খবর দেওয়া হলে সে থানায় খবর দিতে নিষেধ করে। কারণ, ফাঁপিতে এক ভিখিরি বুড়ি মরেছে তা নিয়ে আবার থানা পুলিশ। তাছাড়া থানায় খবর দিলেও পুলিশ আসতে রাত-দুপুর হয়ে যাবে। ততক্ষণে মড়া পচে গন্ধ ছড়িয়ে পড়বে।

এই অবস্থায় সকলেই বিজ্ঞ চৌকিদারের কাছে পরামর্শ চাইল। সে বুড়ির মৃতদেহ নদীতে ফেলে আসার পরামর্শ দেয়। তার কথা মতো বাঁশের চ্যাংদোলায় মড়া ঝুলিয়ে মাঠ পেরিয়ে শুকনো নদীর চড়ায় মৃতদেহ ফেলে আসা হয়। ফিরে এসে সবাই দিগন্তে চোখ রাখল, কখন ঝাঁকে ঝাঁকে শকুন নামে। এরপরই আমরা দেখতে পাই নদীর চড়ায় তপ্ত বালিতে বুড়ির শরীর চিত হয়ে পড়ে আছে।


২. ‘শেষ রোদের আলোয় সে দূরের দিকে ক্রমশ আবছা হয়ে গেল’ – কার কথা বলা হয়েছে ? সে ক্রমশ আবছা হয়ে গেল কেন? ১+৪

বক্তব্যজীবী লেখক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ রচিত ‘ভারতবর্ষ’ গল্পের আলোচনাংশে সুগভীর সমাজ চেতনার পরিচয়কে প্রকাশ করতে দীর্ঘ আয়ুস্মতী, নাম পরিচয়হীনা, ভবঘুরে কুঁজো ভিখিরি বুড়ির কথা বলা হয়েছে।

আলোচ্য গল্পে পৌষে বাদলায় এক ভিখিরি বুড়ি মারা গেছে। তার মৃতদেহ নিয়ে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। তাদের দ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক, যা ভারতীয় গণতন্ত্রের মূল আদর্শ, তারই প্রতিভূ দীর্ঘ আয়ুস্মতী বুড়ি নড়বড়ে পায়ে রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল। পিছনে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল স্তম্ভিত জনতা। তখন শেষ বেলার পড়ন্ত রোদ। চলন্ত বুড়ি ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছে। পড়ন্ত বেলায় রোদের তীব্রতা কমে যাওয়ায় দূর ক্রমশ আবছা হচ্ছে। তাছাড়া বুড়ি ক্রমশ দূরে চলে যাওয়ায় তাকেও আবছা দেখা যাচ্ছে।

এইভাবেই বুড়ি আরও আবছা হয়ে একসময় অবশ্যই অদৃশ্য হয়ে যাবে। মৌলবাদী ভাবনাচিন্তা, সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও হানাহানির অসারতা কে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার জন্যই বুড়ির উপস্থিতি। আর সেই প্রয়োজনীয়তা মিটে যাওয়ার পর তার প্রস্থান এবং দূরে ক্রমশ অদৃশ্য হওয়া অবধারিত। গল্পের শেষে সেই আবছা হওয়াই দেখানো হয়েছে।


৩. ‘হঠাৎ বিকেলে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা গেল।’- অদ্ভুত দৃশ্যটি কী? এই ঘটনাকে ঘিরে দুই ধর্মাবলম্বী মানুষের বচসা, তর্কাতর্কি, মারামারি হওয়ার উপক্রমের ছবিটি বর্ণনা কর। ১+৪

প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ রচিত ‘ভারতবর্ষ’ গল্প থেকে উদ্ধৃত দ্যুতিময় অংশটি সংগৃহীত হয়েছে।

অদ্ভূত দৃশ্য –

চৌকিদারের পরামর্শ মতো নদীর চড়ায় হিন্দুদের ফেলে আসা বুড়ির শবদেহ মুসলমান পাড়ার লোকেরা আরবি মন্ত্র উচ্চারণের সাথে সাথে চ্যাংদোলা করে দেহটিকে কবরস্থ করার উদ্দেশ্যে বাজারের দিকে নিয়ে আসছে। এটিই আলোচ্য অংশের অদ্ভুত দৃশ্য।

দুই ধর্মাবলম্বী মানুষের দ্বন্দ্ব –

বৃক্ষবাসিনী ভিখিরি বুড়ির মৃতদেহ টি চৌকিদারের নির্দেশে হিন্দুরা কজন মিলে নদীর চড়ায় ফেলে এসেছিল। পাড়ার মুসলিম ভাইদের কাছে উক্ত ঘটনাটি অপ্রীতিকর মনে হয়েছে। তারা খবর পেয়ে নদীর চড়া থেকে মৃতদেহটি চ্যাংদোলা করে বাজারের দিকে নিয়ে আসে কবরস্থ করার জন্য। শুরু হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। ‘বুড়ির মৃতদেহ হিন্দু না মুসলিম?’ – এই নিয়ে চলতে থাকে দুই পক্ষের বচসা। তৈরি হয় চরম উত্তেজনা। সকলের হাতেই মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র। দুই পক্ষই চায় যুক্তি, তর্ক, প্রমাণ দিয়ে তাদের মতামতকে প্রতিষ্ঠিত করতে। দুই পক্ষের তর্ক-বিতর্ক চলতে থাকলে প্রচুর লোকের জমায়েত শুরু হয়।

বিকেলের অদ্ভুত দৃশ্যকে ঘিরে আমজনতার হিংস্র লড়াই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ছবিকে প্রকাশ করে। একদিকে মোল্লা সাহেবের – ‘জেহাদ, জেহাদ! নারায়ে তকবির আল্লাহু আকবর’, আর অন্যদিকে ভট্টাচার্য মশাইয়ের হুঙ্কার – ‘জয় মা কালী! যবন নিধনে অবতীর্ণ হও মা’! – এই মানসিকতা বর্বর মনুষ্য সভ্যতার ধর্মান্ধতা তথা মৌলবাদ কে প্রকাশ করে। উত্তেজিত ধর্মান্ধ মানুষের কাছে আইন রক্ষক চৌকিদারের প্রতিরোধ অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। গল্পকার অত্যন্ত সুকৌশলে গল্পের ভাব সৌন্দর্য কে বজায় রেখে উদ্ধৃত বক্তব্যের মাধ্যমে ঘৃণ্য অমানুষিকতার চরম পর্যায়কে সাম্য মৈত্রীর মেলবন্ধনের উদ্দেশ্যে ব্যঞ্জনাবহ করে প্রকাশ করেছেন।


৪. ‘আমি কী তা দেখতে পাচ্ছিস নে?’- কোন প্রশ্নের উত্তরে বক্তা একথা বলেছেন ? গল্পানুসারে বক্তার স্বরূপ উদঘাটন করো।১+৪

উৎস –

মানবতাবাদী লেখক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের উজ্জ্বল সৃষ্টি ‘ভারতবর্ষ’ গল্প থেকে উদ্ধৃত দ্যুতিময় অংশটি সংগৃহীত হয়েছে।

আলোচ্য প্রশ্ন –

প্রশ্নোদ্ধৃত বক্তব্যটির বক্তা হলেন অবহেলিত মাতৃ রূপের প্রতীকী ব্যঞ্জনায় ব্যঞ্জিত ভিখিরি বুড়ি। উত্তেজিত জনতার কণ্ঠে ‘বুড়ি তুমি হিন্দু না মুসলমান?’ – এই প্রশ্নের জবাবে বুড়ি তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যটি করেছেন।

বক্তার স্বরূপ –

গল্পের প্রথম অংশে বুড়ির যে বিবরণ লেখক তুলে ধরেছেন তাতে যে কোনো পাঠকেরই দৃষ্টি আকর্ষিত হয়। বুড়ির চেহারা ও আচার-আচরণের ব্যতিক্রমী রূপ গল্পের পরবর্তী ঘটনার প্রতি পাঠককে উৎসাহিত করে তোলে। গল্পের শুরুতে ভিখিরি ও ভবঘুরে হিসেবে বুড়ির প্রথম আবির্ভাব ঘটে। প্রথম থেকেই তার মেজাজ ছিল অত্যন্ত চড়া। পৌষে বাদলার দিনে প্রকৃতির প্রতিকূলতাকে জয় করে সে হয়েছিল বৃক্ষবাসিনী। হঠাৎ খবর ছড়িয়ে পড়ে বুড়ির অকস্মাৎ মৃত্যুর। মৃতদেহ সৎকারের দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হয় হিন্দু-মুসলমানের চরম উত্তেজনা।

নাটকীয় ভাবে কাহিনীর মোড় ঘুরতে দেখা যায় যখন বিবেক ও মানবতাবোধের আলোকে বুড়ি নতুন চেতনায় জাগ্রত হন এবং উঠে দাঁড়ান। যে জনতা পরস্পরের বিরুদ্ধে অস্ত্র উঁচু করেছিল তারা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে

থাকে। আর বুড়ি সেই ভিড়ের দিকে তাকিয়ে বিকৃত মুখে হেসে ওঠে। সকলেই যখন তার মৃত্যু না হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করে তখন বুড়ি তীক্ষ্ণ কণ্ঠে উত্তর দেয় – ‘তোরা মর, মুখ পোড়ারা!’ সে হিন্দু না মুসলমান – এই প্রশ্নের উত্তরে সে বলে ‘চোখের মাথা খেয়েছিস মিনসেরা? দেখতে পাচ্ছিস নে? 1

আসলে হিন্দু বা মুসলমান ধর্মীয় বিভেদের উর্দ্ধে উঠে মনুষ্যত্ব কেই প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে ভিখিরি বুড়ি। ভিড়কে দুপাশে সরে যেতে বাধ্য করে যে ভাবে সে রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেছে তা চিরজীবী মনুষ্যত্বের জয় ঘোষণা করে এবং শাশ্বত মানবধর্ম কে প্রতিষ্ঠা করে।


৫. ‘ভারতবর্ষ’ ছোটো গল্প অনুসারে ভিখিরি বুড়ির চরিত্রটি বিশ্লেষণ কর। তার চরিত্রের মধ্যে দিয়ে লেখকের অভিপ্রায় সংক্ষেপে লেখ। ৪+১

পরিচিতি –

সমাজ সচেতন লেখক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ রচিত ‘ভারতবর্ষ’ গল্পের মুখ্য তথা কেন্দ্রীয় চরিত্র হল নাম পরিচয়হীন এক বুড়ি। তার চেহারার বর্ণনা প্রসঙ্গে লেখক জানিয়েছেন বুড়ি ছিল রাক্ষসের মতো দেখতে, কুঁজো, এক থুরথুরে ভিখারিণী। তার ক্ষয়ে যাওয়া মুখমণ্ডলের বলিরেখা গুলি স্পষ্ট ভাবে প্রতীয়মান ছিল। মাথা ভরতি সাদা চুলের অধিকারী এই বুড়ির পরনে ছিল ছেঁড়া নোংরা একটি কাপড়, আর গায়ে জড়ানো ছিল তুলোর এক চিটচিটে কম্বল।

আত্মসম্মানবোধ ও মেজাজ –

অসহায় ভিখিরি হলেও বুড়ি ছিল অত্যন্ত তেজি, মেজাজি এবং আত্মসম্মান সম্পন্ন মহিলা। চায়ের দোকানে একজন তাকে ‘কোত্থেকে এলে?’ – জিজ্ঞাসা করায় বুড়ি রুক্ষ মেজাজে উত্তর দিয়েছিল – ‘সে কথায় তোমাদের কাজ কী বাজারে?’ তাকে টাট্টু ঘোড়া বলায় ‘খবরদার’ বলে সে হুঁশিয়ারিও দেয়।

দারিদ্র্যের প্রতিমূর্তি –

ভিক্ষাবৃত্তি পেশা হওয়াই বুড়ির সমস্ত শরীরে দারিদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট। পরনের পোশাক ছিল নোংরা ও ছিন্ন। একমাথা অগোছালো চুল, আর ক্ষয়া খর্বুটে মুখেও ছিল দারিদ্র্যের ক্লান্তি।

সক্ষম দেহী –

বয়স বেশি হলেও বুড়ির দৈহিক ক্ষমতা ছিল প্রবল। শীতের অকাল দুর্যোগে সে বেঁচেবর্তে হেঁটে চায়ের দোকানে এসেছিল। এর থেকেই তার সক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায়।

রসিকতা বোধ –

বুড়ির রসিকতা বোধের পরিচয় আমরা পাই যখন দীর্ঘ ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর চারপাশের মারমুখী হিন্দু-মুসলিম জনতাকে দেখে শুনে সে ফ্যাকফ্যাক করে হেসে ফেলে।

মূল্য সচেতন –

ভিখিরি হলেও চায়ের দোকানে আরাম করে চা খেয়ে সে পয়সা দিয়ে চায়ের ন্যায্য দাম মেটায়। এর থেকে আমরা তার মূল্য সচেতনতার পরিচয় পাই।

সিদ্ধান্তে অবিচল –

বুড়ি কে মৃত ভেবে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে শেষকৃত্য রীতি নিয়ে কাজিয়া শুরু হয়। কিন্তু বুড়ি নিজের পরিচয় ধর্মীয় গোঁড়ামির প্রাচীর এড়িয়ে মানবিকতায় উন্নীত করেছে।

লেখকের অভিপ্রায় –

লেখক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ এই বুড়ি চরিত্রের মধ্যে দিয়েই ভারত মাতার প্রাচীনত্ব, দারিদ্র্য ও অসহায়তাকে যেমন প্রকাশ করেছেন তেমনি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ধর্মনিরপেক্ষতা। বুড়ি চরিত্রের মধ্যে দিয়েই গল্পের জনতাকে এবং পাঠকদের এই চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছেন যে, এ দেশ হিন্দুর নয়, মুসলমানের নয়, এ দেশ আপামর ভারতবাসীর।


Leave a Comment