প্রবন্ধ: পরিবেশ দূষন ও তার প্রতিকার

পরিবেশ দূষন ও তার প্রতিকার

পরিবেশ দূষন ও তার প্রতিকার


“ধনধান্যে পুষ্পে ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা।” 

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়

ভূমিকা

কবির বহু প্রত্যাশিত এই সুজলা সুফলা সমৃদ্ধ দেশ দূষণের কালো ছায়ার গ্রাসে হারিয়ে যেতে চলেছে। আমাদের পারিপার্শ্বিক যেসব সবুজ রঙা চিত্রসমূহ কবিকে অনুপ্রানিত করেছিল কোনো নির্মান কর্মে কিংবা রবীন্দ্রনাথের মনের সুপ্ত গহ্বর থেকে টেনে এনেছিল কোনো ছোটো গল্পকে। তাকেই তো আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ বলি। অর্থাৎ প্রকৃতি মায়ের গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া সন্তানকে আমরা পরিবেশ বলে থাকি। এই পরিবেশ আমাদের চোখে নিছকই অতীতচারী কল্পনা। যেখানে আমরা সামান্য পরিবেশের সান্নিধ্য পেতে চায়, সেখানেই আমাদের দৃষ্টি আটকে যায় ইট-কাঠ-পাথরের তৈরী শুষ্ক প্রানহীন প্রাচীরে। কলকারখানার বিষাক্ত ধোঁয়ার জন্য আমরা নিতে পারি না এক বুক ঠান্ডা নিশ্বাস। গঙ্গা আর পূর্বের মতো আমাদের শীতল শুদ্ধ সূধা ধারায় প্লাবিত করে না। কারণ, কালকারখানার বিষাক্ত ও নোংরা আবর্জনার জল তার শুদ্ধতাকে করেছে কলঙ্কিত। 

প্রকৃতির বিভিন্ন রূপ

জননীরূপা প্রকৃতির সন্তান স্বরূপ জীব সভ্যতা স্বাচ্ছন্দ্য রক্ষার তাগিদে বিভিন্ন রূপে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। আমাদের দৃষ্টিকে সুদূরপ্রসারী করতে এবং প্রাণবায়ুর জোগান দিতে সে আবির্ভূত হয়েছে সবুজ শস্য শ্যামলা রূপে। আমাদের শীতলতা প্রদানের জন্য এবং ধরিত্রীকে রসসিক্ত করবার কারকে সে প্রবাহিত হয়েছে জলধারা রূপে, তার স্নেহ কোমল বুক থেকে অফুরন্ত শস্য ভান্ডারকে উপস্থিত করতেই সে নিয়েছে মৃত্তিকারূপ।

পরিবেশ দূষণ – শহরের পরিবেশ, গ্রামের পরিবেশ :-

মানুষ যতই সভ্যতার রথে চেপে এগিয়েছে, নিজের স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রাখতে সে তিলে তিলে হত্যা করছে তার পরিবেশকে, যার সূত্রপাত হয়েছিল কোন সুদূর অতীতে অগ্রনী প্রজ্বলনের মাধ্যমে। সৃষ্টির মত্ততায় সে ভুলে গেছে কখন সে কমিয়ে আনছে তার চারপাশের সবুজের চাদরকে। শহরের মানুষের কাছে সবুজের সান্নিধ্য আজ বরলাভের মতোই দুষ্প্রাপ্য। জানালা দিয়ে মুক্ত আকাশের পরিবর্তে সে দেখতে পায় ঝুলকালি মাখা আকাশের মলীন রূপকে।

শুধুমাত্র শহরের পরিবেশ নয়, গ্ৰামের পরিবেশও হারিয়েছে তার সেই স্নিগ্ধতা। মলীনতা তাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে চলেছে। বিশ্বব্যাপী দূষণের যে করাল ছায়া তারই প্রভাবে গ্রাম থেকে ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে অজানা পশুপাখি, অচেনা গাছের দল। পদ্মাতীরে রবীন্দ্রনাথ যে শিলাইদহের ছবি দেখেছিলেন, সেই গ্রামীন শিলাইদহ আজ আমাদের সামনে থেকে হারিয়ে গেছে।

বায়ুদূষণ

‘যাহারা তোমার বিষাইছে’ –

যে শুদ্ধ বায়ু আমাদের জীবন ধারণের প্রধান রসদ, সেই প্রান বায়ুর মধ্য দিয়েই আজ বিষ প্রবেশ করছে আমাদের শরীরে। অর্থাৎ এই প্রাণদায়ী বায়ুই আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে জীবনাশী নাগিনীর ভূমিকায়। কলকারখানর কালো বিষাক্ত ধোঁয়া আমাদের জীবন বায়ুকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে চলেছে। উন্নতির শিখরে ওঠার তাগিদে সৃষ্ট বিভিন্ন পারমানবিক অস্ত্র এবং বিস্ফোরনের তেজস্ক্রিয়তা দূষিত করছে বায়ুকে।

জলদূষণ

ভগীরথ যে গঙ্গাকে আহ্বান জানিয়েছিলেন স্বর্গ থেকে তাঁর পূর্বপুরুষদের তর্পনের জন্য সেই গঙ্গা আর আগের মতো শুদ্ধ জলধারায় বিদ্যমান নেই। তাকে আমরা প্রতিনিয়ত বিষাক্ত করে চলেছি কলকারখানার কালো জল ও নোংরা আবর্জনা নিক্ষেপ করে। শুধুমাত্র গঙ্গা নয়, এর শিকার হয়েছে সমগ্র পৃথিবীর তরঙ্গায়িত জলধারা। পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশ জল হলেও মানুষ আজ হাহাকার করছে এক ফোঁটা বিশুদ্ধ জলের প্রত্যাশায়। সভ্যতার ইঁদুর দৌড়ে নিজের জায়গা করে নেওয়ার জন্য সমুদ্রগর্ভ থেকে আমরা উত্থিত করছি তেল,  আমাদের অসাবধানতার জন্য যা মিশছে সমুদ্রের জলে। এর ফলে ভূষিত হচ্ছে জল এবং পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছে লুপ্তপ্রায় সামুদ্রিক জীব।

ভূমিদূষণ

‘ফিরে চল মাটির টানে’ –

যে গর্ব নিয়ে আমরা বলি ‘আমরা সভ্য’, সেই সভ্যতার অগ্রগতির সিঁড়িতে পদপৃষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছে মুক্তিকা মায়ের স্বাভাবিক রূপ। কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রে অত্যাধিক উন্নতির প্রত্যাশায় আমরা এই মৃত্তিকা মায়ের বুকে ঢেলে দিচ্ছি মানা কীটনাশক, রাসায়নিক সার এবং কলকারখানার নানাবিধ বিষাক্ত বর্জ্য পদার্থ। এতেও থেমে থাকছে না মানুষ। একের পর এক সবুজের প্রাণ হরনের ফলে বৃদ্ধি পাচ্ছে ভূমিক্ষয়।

শব্দদূষণ

পূর্বে যে মানুষের ঘুম ভাঙাতো পাখ-পাখালির মধুর কলকাকলীতে, সেই মানুষের ঘুম ভাঙছে আজ কলকারখানার কর্কশ কন্ঠস্বরে। মানুষের মনন রাজ্যের চিন্তাভাবনার সূক্ষ্ম তার গুলিকে ছিন্ন করে চলেছে বিভিন্ন দানবীয় যানবাহনের তীব্র হুঙ্কার। উৎসব-অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত মত্ততা প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত লাউড স্পীকার কুপ্রভাব ফেলছে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার মস্তিষ্ক কোশে। এর ফলেই সৃষ্টি হচ্ছে মানসিক রোগী। 

দূষণের আগ্রাসী ফল

মানুষ আজ দূষণরূপী অক্টোপাসের শুঁড়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বন্দী। আমাদের চারপাশের পরিবেশের কোনো কিছুকেই হলফ করে শুদ্ধ বলা যায় না। উন্নতির আলোকশিখার পেছনে মানুষ নিজের অজান্তেই আহ্বান জানিয়েছে বিভিন্ন মারণ রোগকে। যেমন – মাথাধরা, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, হৃদযন্ত্রের দুর্বলতা এবং দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যানসার, যার অন্যতম প্রমাণ হল ওজোন স্তরের গায়ে সৃষ্ট ছিদ্র। এর ফলে ক্ষতিকারক অতিবেগুনী রশ্মি প্রবেশ করছে পৃথিবীতে। বসুন্ধরা থেকে ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে চাষ যোগ্য জমির পরিমাণ। অতিরিক্ত শব্দ জালে বন্দী হয়ে মানুষের মস্তিষ্ক ক্রমশ শিথিল হয়ে পড়ছে, সে এগিয়ে চলছে মানসিক পঙ্গুতার দিকে। 

পরিত্রাণের উপায়

সভ্যতার আদিতে মানুষ নিজের অজান্তে যে দূষণকে আহ্বান জানিয়েছিল তা আজ দানবী রূপ ধারণ করে মানুষের প্রাণ সংহারে উদ্যত। তাই এর থেকে পরিত্রাণের উপায় হিসেবে যে কাজ গুলি আমাদের করতে হবে সেগুলি হল –

  • (ক) সর্বপ্রথমে মানুষের আতিরিক্ত উৎশৃঙ্খলতা, উদ্যামতা কমাতে হবে।
  • (খ) কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা চিকিৎসা কেন্দ্রের পাশে লাউড স্পীকার বাজানো বন্ধ করতে হবে। কারখানা স্থাপন করতে হবে মনুষ্য বসতি মেকে দূরে। 
  • (গ) সর্বোপরী বৃক্ষ রোপন করতে হবে।

প্লাস্টিক দূষণ

সভ্যতার নতুন দূষণ –

দূষণ নিয়ে ঘরে বাইরে যখন সতর্কতার শেষ নেই, ঠিক সেই সময়ে মানুষের চিন্তার জটকে আরও শক্ত করে বেঁধেছে প্লাস্টিক দূষণ। শুধু শহর কেন, শহরতলী থেকে গ্রাম সর্বত্রই প্লাস্টিকের জিনিসপত্র আদান প্রদানকে শুধু ফ্যাশন বলে উড়িয়ে দিলে ভুল হবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে প্লাস্টিক পচনশীল নয় বলেই তা বিপজ্জনক বর্জ্য পদার্থে পরিণত হচ্ছে।

শেষকথা – ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’

‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লহ এ নগর।’

– এ শুধু কবির মনের কথা নয়, এ যেন বর্তমানের প্রতিটি মানুষের মননরাজ্য থেকে উচ্চারিত কথা। অতিরিক্ত ভোগবিলাসের মায়াজাল কাটিয়ে শুভ বুদ্ধির উদয় মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে চলেছে পূর্বের প্রকৃতির বুকে, যার ফল হল ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’। মানুষের মধ্যে যে পরিবেশ সচেনতা বৃদ্ধি পাছে তারই উদাহরণ এটি। দূষণের কুটিল ভ্রূকুটি থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রতিবছর ৫ই জুন পালন করা হয় পরিবেশ দিবস। আমরা আজ সমস্বরে উচ্চারণ করি,

                           ‘হে মানুষ, গাছ কাটিয়া মরুভূমি না ডাকিয়া আনো।’

Leave a Comment