প্রবন্ধ: বাংলার উৎসব

প্রবন্ধ বাংলার উৎসব

প্রবন্ধ – বাংলার উৎসব


ত বঙ্গ ভঙ্গ দেশ, তবু রঙ্গে ভরা।”

ঈশ্বর গুপ্ত

ভূমিকা :-

যে পবিত্র অনুষ্ঠানে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার আনন্দমূলক নিষ্কলুষ সমাবেশ ঘটে তাকে বলা হয় উৎসব। বাঙালির জীবনে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বারো মাসের তেরো পার্বন বৈচিত্র্য বহন করে নিয়ে আসে। উৎসব যেন মানুষের শান্তি, মিলন, মৈত্রীর ত্রিবেণী বন্ধন রচনা করে।

উৎসবের উদ্দেশ্য :-

বাঙালির উৎসরের উদেশ্য হল প্রীতি ও প্রেমের পূর্ণ বন্ধন। আমার ভালোর সঙ্গে সঙ্গে আর পাঁচ জনের ভালো হোক এটাই উৎসবের প্রান। উৎসব মানে সুখ-দুঃখকে সকলে ভাগ করে নেওয়া, বৈচিত্র্যের মধ্যে আনন্দ উপভোগ করা, উৎসব মানে সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি। উৎসবের উদ্দশ্য হল সাম্য, মৈত্রী, স্বাধানতার বাণি সকলের মধ্যে প্রচার করে বাঙালীর মনকে সতেজতায় ভরিয়ে তোলা।

উৎসবের শ্রেণীবিভাগ :-

রূপসী বাংলার প্রকৃতির সুরে সুর মিলিয়ে বাঙালির জীবনে উৎসব আসে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বহন করে। বাঙালির উৎসবের বৈচিত্র্য চোখে পড়বার মতো। যেমন – 

  • (১) পারিবারিক উৎসব, 
  • (২) সামাজিক উৎসব,
  • (৩) ধর্মীয় উৎসব, 
  • (৪) জাতীয় উৎসব,
  • (৫) সাংস্কৃতিক উৎসব, 
  • (৬) ঋতুকেন্দ্রীক উৎসব,
  • (৭) আঞ্চলিক উৎসব

(১) পারিবারিক উৎসব :-

একটি শিশু জন্ম গ্রহনের পরেই তার জন্মকে কেন্দ্র করে ষষ্ঠী পূজা, অন্নপ্রাশন বেশ বড়ো করেই হয়। তারপর শিক্ষা গ্রহণের পূর্বে হাতে খড়ি। ব্রাহ্মণ সন্তান হলে উপনয়ন। বিবাহ উপলক্ষ্যে গায়ে হলুদ, বাসি বিবাহ ইত্যাদি। আবার মৃত্যুর পরেও শ্রাদ্ধ, নিয়মভঙ্গ ইত্যাদি। এছাড়া ভ্রাতৃদ্বিতীয়া ও জামাইষষ্ঠী তো আছেই।

(২) সামাজিক উৎসব :-

সামাজিক উৎসব উপলক্ষ্যে বহু মানুষ একত্রে সমাবেশ হয়। সামাজিক উৎসব মূলত পার্বন ও মেলা কেন্দ্রীক। সামাজিক উৎসব উপলক্ষ্যে বহু মানুষ একত্রিত হয় এবং নৃত্য, গীত এবং অভিনয়াদির মাধ্যমে আনন্দ উপভোগ করে।

(৩) ধর্মীয় উৎসব :-

ধর্মকে কেন্দ্র বছর যত উৎসবের আয়োজন। ভারতবর্ষের মতো ধর্মীয় ঐতিহ্যকে অবলম্বন করে বিশ্বে নিজের স্বতন্ত্র আসন করে নিয়েছে। স্বামী প্রণবানন্দের সঙ্গে আমরাও সহমত পোষন করি যে, এই দেশ ইউরোপের মতো জড়বাদী নয়। সুতরাং এখানে ধর্ম নির্ভর কতকগুলি উৎসব হয়। যেমন –

  • (ক) হিন্দু ধর্ম নির্ভর উৎসব :- দূর্গাপূজা, কালীপূজা, শিবরাত্রী, জন্মাষ্টমী, লক্ষ্মী পূজা, সরস্বতী পূজা ইত্যাদি।
  • (খ) মুসলমান ধর্ম নির্ভর উৎসব :- ঈদ, মহরম, সবেবরাত ইত্যাদি 
  • (গ) খ্রিস্টান ধর্ম নির্ভর উৎসব :- বড়োদিন

এছাড়া গুরু পূর্ণিমা, বুদ্ধ পূর্ণিমা, গুরু নানকের জন্মোৎসব মহা সমারোহে পালিত হয়।

(৪) জাতীয় উৎসব :-

বাঙালির জাতীয়তাবোধের প্রকাশ ঘটেছে যে উৎসবগুলিকে কেন্দ্র করে সেগুলি হল – দোল উৎসব, রাখীবন্ধন উৎসব, প্রজাতন্ত্র দিবস, স্বাধীনতা দিবস ইত্যাদি। এগুলিতে হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে প্রত্যেকে আংশগ্রহন করে।

(৫) সাংস্কৃতিক উৎসব :-

মূলত কৃতী মানুষদের স্মরণ করে এবং জাতীয় ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সাংস্কৃতিক উৎসব পালিত হয়। যেমন – রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী, নজরুল জন্মজয়ন্তী, গান্ধিজী জন্মজয়ন্তী উৎসব ইত্যাদি। এছাড়া বিদায়ী সম্মিলনীর মতো অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সংস্কৃতি মনস্ক বাঙালির প্রাণের সংবাদ পাওয়া যায়।

(৬) ঋতুকেন্দ্রীক উৎসর :-

ঋতুচক্রের সঙ্গে বাঙালীর প্রাণের সম্পর্ক তাত্যন্ত গভীর। ঋতুকেন্দ্রীক উৎসবগুলি মূলত কৃষি নির্ভর। যেমন – হলকর্ষণ উৎসব, নবান্ন, বৃক্ষরোপন ইত্যাদি। 

আঞ্চলিক উৎসব :-

অঞ্চল বিশেষে প্রচলিত উৎসব হল আঞ্চলিক উৎসব। আঞ্চলিক বা লৌকিক উৎসব সাধারণত আচার-অনুষ্ঠান ও লৌকিক দেবদেবীর সঙ্গে যুক্ত। যেমন – টুস, ভাদু ইত্যাদি।

উৎসবের তাৎপর্য :-

উৎসব বাঙালির কাছে অপব্যয় বা অপচয় নয়। উৎসব নিয়ে আসে বাঙালীর জীবনে নব নব সৃষ্টির প্রেরণা। উৎসবের মধ্য দিয়ে আমাদের সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ঐতিহ্যের মূল্য সকলের কাছে আকর্ষনীয় হয়ে ওঠে। উৎসবের মধ্য দিয়েই মানুষ প্রতিকূলকে জয় করেছে। দুঃখের কালো মেঘ অতিক্রম করে প্রাণ প্রাচুর্যে ভরে তুলতে পেরেছে তার জীবনে। এখানেই উৎসবের সার্থকতা।

বর্তমান কালের উৎসব :-

যন্ত্রসভ্যতার যুগে বাঙালীর উৎসবের মেজাজ গেল বদলে। তার অন্তরে আর সেদিনের মতো সাড়া জাগে না। হয়তো বা উৎসবে হিন্দি গান বাজে, ঘটা করে সাজানো হয় মণ্ডপ, আলোর ঝিলিক দিয়ে সৌন্দর্য বাড়ানো হয় কিন্তু তাতে প্রাণ থাকে না। বহিরঙ্গে আজ উৎসবের প্রাণ হারিয়ে গেছে।

উপসংহার :-

উৎসব মানে নগ্ন আনন্দ-উচ্ছ্বাস নয়, উৎসব মানে বহিরঙ্গ বিলাশ নয়, নয় অশালীনতা। উৎসব মানে প্রকৃত স্বর্গীয় পরিবেশ রচনা করা। উৎসব মানে প্রেম, উৎসব মানে বিবেক, উৎসব মানে মনুষ্যত্বের জাগরণ। তাই কবির কথায় –

” প্রীতি প্রেমের পূর্ণ বাঁধনে 

যবে মিলি পরস্পরে

স্বর্গ আসিয়া দাঁড়ায় তখন

আমাদের কুঁড়ে ঘরে।”

  – কামিনী রায় 

                                                                  

Leave a Comment